কদমবুসি ও সামাজিক রীতি: শ্রদ্ধা, প্রথা এবং সচেতন যুব সমাজ



কদমবুসি ও সামাজিক রীতি: শ্রদ্ধা, প্রথা এবং সচেতন যুব সমাজ

— তৌহিদ রাসেল




ক্লাসরুমের আজকের সকালটি ভীষণ শান্ত ছিল। আমি ‘Quasi passive verb + no complement’ বিষয়টি বোঝাচ্ছিলাম। বোর্ডে লিখছি, ছাত্ররা মনোযোগ দিয়ে বসে আছে। হঠাৎ, দু’জন এসএসসি পরীক্ষার্থী দৌড়ে এসে দরজায় দাঁড়াল। চোখে ভয়ের মিশ্রণ, আর মুখে আশা।

তারা এক মুহূর্তে আমার কাছে এসে দাঁড়াল, তারপর পা ধরে সালাম করতে শুরু করল। ক্লাসের অন্যান্য ছাত্ররা চুপচাপ দেখছিল। আমি সামান্য সরে গিয়ে বললাম,

“থাক, থাক, সালাম করতে হবে না। যাও, ভালোভাবে পরীক্ষা দাও।”

ছোটবেলা থেকে আমরা এই দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত। ঈদের সময় এটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। ছোটরা বড়দের পা ধরে সালাম করে, আর বড়রা বিনিময়ে কিছুটা বকশিশ বা আশীর্বাদ দেয়। বিয়ে বাড়িতেও দেখা যায়—নতুন বউ তার শাশুড়ি বা পরিবারের সিনিয়রদের পা ধরে সালাম করছে।


কদমবুসির পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি

অনেকে এই রীতিকে পক্ষে বা বিপক্ষে আলোচনা করে।

পক্ষে যুক্তি:

  • এটি বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর একটি সুন্দর উপায়।
  • সম্মান প্রদর্শন দোষের কিছু নয়, বরং এটি সওয়াবের কাজ।
  • রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,

“যে বড়দের সম্মান করে না এবং ছোটদের স্নেহ করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”

  • কুরআন ও অন্যান্য হাদিসের আলোকে তারা যুক্তি দেখায়, দেখাতে চাই যে গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিপক্ষে যুক্তি:

  • এটি পা ধরে সালাম নয়, বরং কদমবুসি।
  • ইসলামে সালাম মানে মুখে বলা—আসসালামু আলাইকুম
  • কুরআন স্পষ্টভাবে বলে, আল্লাহ ব্যতিত কারো সামনে মাথা নত করো না।
  • পা ধরে সালাম করলে স্বাভাবিকভাবেই মাথা নত হয়। তাই এই রীতি জায়েজ নয়।

ইতিহাস ও সাহাবিদের উদাহরণ

হিজরতের সময় সাহাবিরা আবিসিনাতে হিজরত করেছিলেন। কুরাইশরা তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য সম্রাট নাজ্জাশীর কাছে যান। সম্রাট সাহাবিদের ডাকলেন। সাধারণ মানুষ মাথা নত করে সম্রাটকে শ্রদ্ধা জানাল, কিন্তু সাহাবিরা দাঁড়িয়ে রইল।

প্রশ্ন করা হলো—“কেন মাথা নত করলেন না?”
সাহাবিরা বলল, “মুহাম্মদ (সাঃ) আমাদের শিখিয়েছেন, আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথা নত করা যাবে না।”
সম্রাট নাজ্জাশী সেই উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন এবং তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বন্ধ করলেন।


হাদিসে শিষ্টাচারের নির্দেশনা

আনাস (রাঃ) থেকে জানা যায়, একজন মানুষ প্রশ্ন করলেন—

“হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে কেউ যখন তার ভাই বা বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন কি মাথা ঝুঁকাবে?”
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “না।”
মানুষটি আবার জিজ্ঞেস করল—“তাহলে কি শুধু হাত ধরবে ও মুছাফা করবে?”
উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ।”

এটি স্পষ্ট করে দেয়—শিষ্টাচারের সীমা ঠিক আছে, কিন্তু পা ধরে সালাম নেই।


কদমবুসির সামাজিক প্রেক্ষাপট

কদমবুসির উৎপত্তি মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে। হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ মনুসংহিতা-তেও এর চিহ্ন পাওয়া যায়। বেদের শিক্ষক বা পুরোহিতরা সাধারণত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের। ধর্ম অনুযায়ী তারা ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তাই ছাত্রদের অবশ্যই শিক্ষকের পা স্পর্শ করতে হবে—ডান পা ডান হাতে, বাঁ পা বাঁ হাতে। এটিই ব্রাহ্মণাঞ্জলি।

আমাদের আলোচনায় হিন্দু ধর্মের এই প্রসঙ্গ টানা হয়েছে শুধু ইতিহাস বোঝার জন্য, কাউকে হেয় করার জন্য নয়।


নিজের ধর্ম অনুসরণই মূল বিষয়

তুমি কোন ধর্মের, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। যদি তুমি নিজের ধর্ম মানো, তবে সেই পথ অনুসরণ করো। ইসলামে কদমবুসি অনুমোদিত নয়। ছোট কেউ কদমবুসি করতে এলে তাকে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে বোঝানো উচিত। হেয় বা তিরস্কার করলে বিপরীত প্রভাব পড়ে।

অনেক মুরব্বি ভুল করে মনে করেন, কদমবুসি ইসলামের অংশ। তাদের বোঝানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মসজিদে ইমামের বয়ান বা ওয়াজ।


ছোট আচরণও শিক্ষণীয়

কদমবুসির বাইরে আরও কিছু সামাজিক আচরণ আছে—

  • বই, খাতা, কলম বা টাকা খুঁজে পেলে চুমু দেওয়া
  • পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে পেলে চুমু দেওয়া
  • দোকানদারের প্রথম বিক্রি বা গাড়িওয়ালার প্রথম ভাড়া পাওয়া
  • ভুলবশত কারো পায়ে পা লেগে গেলে, হাত স্পর্শ করে নিজের বুকে চুমু দেওয়া

অনেকে এগুলোকে ধর্মীয় বা সামাজিক রীতি মনে করে। ইন্টারনেটেও এসব বিষয়ে অনেক আর্টিকেল আছে।


শিক্ষিত সমাজ ও সত্যের অনুসন্ধান

আজকের সমাজ শিক্ষিত ও সচেতন। তরুণরা অন্ধভাবে অনুসরণ করতে চায় না। তারা জানতে চায় সত্য, বুঝতে চায়। সত্য জানতে চাইলে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু যারা সত্য খুঁজে না, মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরে রাখে, তাদের জন্য কুরআন সতর্ক করেছে—

“আর যখন তাদেরকে কেউ বলে যে, সে হুকুমেরই আনুগত্য কর যা আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে কখনো না, আমরা তো সে বিষয়েরই অনুসরণ করব যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে দেখেছি। যদিও তাদের বাপ দাদারা কিছুই জানত না, জানত না সরল পথও।” [সুরা আল বাক্বারাঃ১৭০]

মানুষ ভুল করে। আল্লাহ দয়ালু, তিনি আমাদের ভুল ক্ষমা করেন।

“তোমাদের মধ্যে যে কেউ অজ্ঞতাবশত কোন মন্দ কাজ করে, অনন্তর এরপরে তওবা করে নেয় এবং সৎ হয়ে যায়, তবে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, করুণাময়।” [সুরা আল-আন’আমঃ৫৪]

ভুল করা মানেই শেষ নয়। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সৎ পথে ফিরে আসাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।




Comments

Popular posts from this blog

সমকাম বা হোমোসেক্সুয়াল

বিভিন্ন ধর্মে নারীর পর্দা- তৌহিদ রাসেল

এক নজরে দোহার উপজেলা