রাইট অফ লোন কী? কেন করা হয়? গ্রাহকের উপর এর প্রভাব – বিস্তারিত আলোচনা

 



🏦 রাইট অফ লোন কী? কেন করা হয়? গ্রাহকের উপর এর প্রভাব – বিস্তারিত আলোচনা

✦ ভূমিকা

ব্যাংকিং খাতে প্রায়ই একটি শব্দ শোনা যায় — “রাইট অফ লোন” (Loan Write-Off)
অনেক গ্রাহক মনে করেন, রাইট অফ মানেই বুঝি ঋণ মাফ হয়ে গেছে। বাস্তবে বিষয়টি ঠিক তেমন নয়।
এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় জানবো —

  • রাইট অফ লোন কী
  • কেন ব্যাংক লোন রাইট অফ করে
  • রাইট অফ হলে গ্রাহকের দায় শেষ হয় কি না
  • বাস্তব উদাহরণ

✦ রাইট অফ লোন কী?

রাইট অফ লোন হলো একটি হিসাব-নিকাশ বা অ্যাকাউন্টিং প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যাংক এমন একটি ঋণকে তাদের ব্যালেন্স শিট থেকে সম্পদ (Asset) হিসেবে বাদ দেয়, কারণ ব্যাংক মনে করে ওই ঋণটি আদায় হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বা প্রায় অসম্ভব

সহজভাবে বললে —
👉 অনেকদিন ধরে যে ঋণের টাকা আদায় হচ্ছে না, সেটিকে ব্যাংক হিসাবের খাতা থেকে “খারাপ ঋণ” হিসেবে বাদ দেয়।
👉 কিন্তু এতে ঋণটি মাফ হয়ে যায় না।


✦ কেন ব্যাংক লোন রাইট অফ করে?

ব্যাংক সাধারণত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে ঋণ রাইট অফ করে থাকে —

১️⃣ ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার রাখার জন্য

যেসব ঋণ দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকে (Non-Performing Loan / NPL), সেগুলো ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে থাকলে —

  • ব্যাংকের সম্পদের মান খারাপ দেখায়
  • আর্থিক অবস্থান দুর্বল মনে হয়

তাই এসব খারাপ ঋণ রাইট অফ করে ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার রাখা হয়


২️⃣ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম মানার জন্য

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকে —

  • কতদিন অনাদায়ী থাকলে ঋণ Classified হবে
  • কত Provision রাখতে হবে
  • কখন Write-Off করা যাবে

এই নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর ব্যাংক বাধ্য হয়ে কিছু ঋণ রাইট অফ করে।


৩️⃣ ট্যাক্স ও লাভ-ক্ষতির হিসাব ঠিক রাখতে

রাইট অফ করা ঋণ ব্যাংকের জন্য একটি ক্ষতি (Loss) হিসেবে গণ্য হয়।
এতে —

  • ব্যাংকের প্রকৃত লাভ-ক্ষতির হিসাব সঠিক থাকে
  • কর (Tax) হিসাবেও কিছু সুবিধা পাওয়া যায়

4️⃣ নতুন ঋণ কার্যক্রমে মনোযোগ দিতে

খারাপ ঋণ হিসাব থেকে বাদ দিলে —

  • ব্যাংক ভালো গ্রাহক ও নতুন ঋণে মনোযোগ দিতে পারে
  • Risk Management সহজ হয়

✦ গুরুত্বপূর্ণ কথা: Write-Off মানে ঋণ মাফ নয় ❌

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

👉 রাইট অফ মানে ঋণ মাফ নয়।
👉 গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের দায় আইনগতভাবে তখনও থাকে।

ব্যাংক চাইলে —

  • মামলা চালিয়ে যেতে পারে
  • আইনগত নোটিশ পাঠাতে পারে
  • ভবিষ্যতে টাকা আদায়ের চেষ্টা চালাতে পারে

শুধু হিসাবের খাতায় ঋণটি আর “সম্পদ” হিসেবে দেখানো হয় না।


✦ একটি বাস্তব উদাহরণ

ধরা যাক —

  • একজন গ্রাহক নিয়েছে ঋণ: ৳ ১০,০০,০০০
  • কয়েক বছর ধরে কোনো কিস্তি পরিশোধ করছে না
  • মামলা হয়েছে, নোটিশ গেছে, কিন্তু আদায় হয়নি

ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী পর্যাপ্ত Provision রেখে শেষ পর্যন্ত ঋণটি Write-Off করলো।

ফলাফল —

✔️ ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে আর এই টাকা Asset হিসেবে নেই
✔️ ব্যাংকের হিসাব পরিষ্কার হলো
❌ কিন্তু গ্রাহক এখনও আইনগতভাবে এই টাকা পরিশোধের জন্য দায়বদ্ধ

পরবর্তীতে যদি ব্যাংক ৳ ২,০০,০০০ উদ্ধার করতে পারে — সেটি ব্যাংকের জন্য আয় (Recovery Income) হিসেবে ধরা হবে।


✦ রাইট অফ হলে গ্রাহকের কী সমস্যা হয়?

রাইট অফ হওয়া গ্রাহকের জন্য কিছু গুরুতর প্রভাব থাকে —

🔹 CIB রিপোর্ট খারাপ হয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের CIB-তে গ্রাহক খেলাপি হিসেবে দীর্ঘদিন রেকর্ডে থাকে

🔹 ভবিষ্যতে ঋণ পাওয়া কঠিন

অন্য কোনো ব্যাংক সাধারণত —

  • নতুন ঋণ দিতে চায় না
  • ক্রেডিট কার্ড, লোন, লিমিট সব কঠিন হয়ে যায়

🔹 মামলা ও আইনগত ঝুঁকি থাকে

রাইট অফ হলেও —

  • মামলা চলতে পারে
  • সম্পত্তি নিলাম হতে পারে
  • গ্রেফতারি পরোয়ানাও হতে পারে

✦ ব্যাংক কি Write-Off এর পরও টাকা আদায় করে?

হ্যাঁ, অবশ্যই।

Write-Off হলো শুধু হিসাবের পদ্ধতি।
ব্যাংকের Recovery বিভাগ সাধারণত —

  • মামলা চালায়
  • সমঝোতা করে
  • এককালীন নিষ্পত্তি (Settlement) করে

অনেক সময় Write-Off হওয়া ঋণ থেকেও ব্যাংক ভালো অঙ্কের টাকা উদ্ধার করতে পারে


✦ উপসংহার

রাইট অফ লোন কোনো “ঋণ মাফ” নয়।
এটি মূলত ব্যাংকের হিসাব-নিকাশের একটি পদ্ধতি, যাতে —

  • ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার থাকে
  • আর্থিক অবস্থা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়
  • ব্যাংক ভালো কার্যক্রমে মনোযোগ দিতে পারে

কিন্তু গ্রাহকের দায় শেষ হয় না।
বরং ভবিষ্যতে তার জন্য ঋণ নেওয়া আরও কঠিন হয়ে যায়।



Comments

Popular posts from this blog

সমকাম বা হোমোসেক্সুয়াল

বিভিন্ন ধর্মে নারীর পর্দা- তৌহিদ রাসেল

এক নজরে দোহার উপজেলা