আদর্শবান শিক্ষক

শীতকালের বিকেলবেলায় মেঘুলা ব্রীজে বসে বাদাম চিবাচ্ছিলাম। দুর থেকে আমার পরিচিত একজন টিচারকে দেখলাম সে তার সাথে দুইজন ছাত্রকে নিয়ে ব্রীজের দিকে আসতেছে। স্যার আসতেছে আর আমি বাদাম চিবাচ্ছি।

হঠাৎ একটা কান্ড ঘটে গেলো। একটা মাল বুঝাই ভ্যান ব্রীজে উঠাইতে ভ্যানওয়ালার কষ্ট হচ্ছিলো।
স্যারের চোখে পড়া মাত্রই স্যার দৌড়ে এসে হাত লাগালেন ভ্যানের পিছনে। তার এহেন কান্ড দেখে ছাত্র দুজন হতভম্ব হয়ে গেছিলো। আমিও খানিকটা টাস্কি খাইছিলাম।

ছাত্র দুজন ভৌ দৌড় দিয়ে এসে হাত লাগালো ভ্যানে। আর তারা বলতে লাগলো-
''স্যার আপনি ছেড়ে দিন আমরা উঠাতে পারবো''
স্যার বললো-
''সমস্যা নাই তিনজনে ঠেললে তারাতারি উঠে যাবে''
একজন বললো-
"স্যার আপনি ঠেললে মানুষ অন্য ভাবে চিন্তা করবে,  আপনি ছেড়ে দিন প্লিজ।"
স্যার ছাত্রদের কথায় থাকতে না পেরে ছেড়ে দিলেন। তারা দুজন ভ্যান ঠেলতেছে আর আমি বাদাম চিবাচ্ছি। কারণ, আমি দৌড় দেওয়ার আগেই ছাত্র দুজন ঠেলা দেওয়া শুরু করে দিয়েছে।

স্যার যখন আমাকে ক্রস করে যাচ্ছিলো তখন ব্রীজের সাইটে উপরে বসা থেকে দাড়িয়ে স্যার কে সালাম দিলাম। স্যার হাসিমুখে সালাম নিলেন এবং তার দুজন ছাত্রকে নিয়ে কথা বলতে বলতে চলে গেলেন। তারা চলে যাচ্ছে আর আমি বাদাম চিবাচ্ছি।

এই ঘটনা আমার মনে কেনো জানি দাগ কেটেছিলো। তাই ভেবেছিলাম স্যার কে কখনো একা পেলে জিজ্ঞেস করবো। এই সেই অনেক কিছু ভাবিতেছি আর বাদাম চিবাচ্ছি।

সপ্তাহখানেক পর স্যারের সাথে একদিন বিকেলে দেখা হয়ে গেলো। রং চা স্যারের খুব প্রিয় তাই স্যারকে চা খাওয়ার অনুরোধ করলাম। স্যার চা খেতে রাজি হলেন। দোকানদার চা সামনে রাখলো আমরা দুজনে চুমুক দিলাম চায়ে।

আমি এক চুমুক দিয়েই স্যারকে সেই বিষয়টা সমন্ধে প্রশ্ন করলাম। আমি বললাম-
"স্যার, গত সপ্তাহে আপনার একটা ঘটনা আমার মনে দাগ কেটেছে। তাই সেই বিষয় সমন্ধে কিছু জানতে চাচ্ছি।"
স্যার বললেন-
"কি ঘটনা খুলে বলো।"
আমি বললাম-
"স্যার, গত সপ্তাহের বিকেল বেলায় আপনি ব্রীজের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন। একটা ভ্যান উঠতে পারতেছিলো না। তাই আপনি এসে ঠেলা দিলেন। আপনি আপনার ছাত্রদের বললে ওরা চোখ বুঝে তা পালন করতো। কিন্তু আপনি তা না করে নিজেই কেনো ঠেলা দিলেন??"

স্যার চা খাচ্ছিলো আর মুচকি মুচকি হাসতেছিলো। স্যার হাসলে মনে হয় পৃথিবীতে স্যারের চেয়ে সুন্দর করে কেউ হাসতে পারবে না।
স্যার আরেক চুমুক দিয়ে বলা শুরু করলেন-
"শোনো রাসেল, আমি ওদের আদেশ দিলে ওরা তা করতো সেটা জানি। কিন্তু ওদের ভিতর কোনো অনুভূতি তৈরি হতো না। আট দশটা আদেশের মতই ওরা মনে করতো।"
এইটুকু বলে স্যার আরেক চুমুক চা মুখে নিলেন।

এরপর আবার বলা শুরু করলেন-
"এই রকম অনেক কাজ আছে যা মানবিক যেগুলি করা সকলের প্রয়োজন সেটা জাগ্রত হতো না। তাই আমি নিজে হাত লাগালাম আদেশ না দিয়ে। যাতে ওদের ভিতর এই টুকু কাজ করেছে এই কাজ আমাদের সকলের করা উচিৎ। আর ভবিষ্যতে ওরা এই রকম কাজ করে যাবে এই ঘটনার পর থেকে। কারন এইটা ওদের মানসিক চিন্তা ধারায় প্রভাব পড়েছে।"

চায়ের কাপে আরেক চুমুক দিলেন এবং বললেন-
"শোনো রাসেল, পৃথিবীটা এখন আদেশের গোলাম হয়ে গেছে। বড় ভাই আদেশ দেয়, লিডার আদেশ দেয়, টিচার আদেশ দেয়, সামাজিক সংগঠনের প্রধানেরাও আদেশ দেয় তাদের কর্মীদের।  কিন্তু কেউ আগে করে দেখায় না যে কিছু কাজ আমাদের সকলের করা উচিৎ।
তাই পৃথিবী এখন আদেশের গোলাম।"

স্যার চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাড়ালেন। আমার চা অর্ধেক তখনো শেষ হয়নি। শেষ হবেই বা কি করে আমি যে স্যারের কথার মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম। স্যার মানিব্যাগ বের করে টাকা দিতে গেলেন আমি স্যারকে বললাম-
"স্যার আপনাকে আমি চা খাওয়াতে চেয়েছি তাই আমাকে দিতে দিন।"

স্যার জোর করে দোকানদার কে ১০ টাকা দিয়ে দিলেন এবং মুচকি হাসি দিয়ে আমার বাহুতে হাত রেখে বললেন-
"তুমি বড় হও তখন যত খুশি আমাকে চা খাওয়াইও"

Comments

Popular posts from this blog

সমকাম বা হোমোসেক্সুয়াল

বিভিন্ন ধর্মে নারীর পর্দা- তৌহিদ রাসেল

এক নজরে দোহার উপজেলা